মুহাম্মাদ রহীম বাওয়া মুহি উদ্দীন (রাহঃ)

তিনি ছিলেন আমাদের মতই একজন ইমিগ্র্যান্ট

আবূ আব্দিল্লাহ মুহাম্মাদ আইনুল হুদা

 

আমেরিকায় আগমন, প্রথম প্রকাশ, বই পুস্তক, কারামত, মসজিদ,

 

পনির কূপ, মাজার, উরস, শেষ কথা

 

 

তিনি ছিলেন আমাদের মতই একজন ইমিগ্র্যান্ট৷ ব্যবধানটা হচ্ছে, তাঁর অসাধারণ কীর্তি আমেরিকান ইসলামিক হিস্ট্রিতে তাঁকে অমর করে রেখেছে আর আমরা ভুগছি আমাদের অস্থিত্বের সংকটে৷ তাঁর মাজার জিয়ারতের জন্য প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ আসে, বার্ষিক উরস হয়, আমরা যদি মারা যাই আমাদের কবর জিয়ারতের জন্য বছরে কয়জন লোক আসতে পারে বলে আমরা আশা করতে পারি! ইংরেজী ভাষার সাথে তাঁর ছিলনা সামান্যতম কোন পরিচিতি, তামিল বংশদ্ভুত বলে তামিল ছাড়া আর কোন ভাষাই তিনি জানতেন না অথচ তাঁর কাছে শাহাদাত পড়েছেন শুধু মাত্র উত্তর আমেরিকা ও কানাডার বহু নামী-দামী ইউনিভার্সিটি থেকে পি,এইচ,ডি করেছেন বা উচ্চতর ডিগ্রী নিয়েছেন এমন শত শত মানুষ৷

 

মুহাম্মাদ রহীম বাওয়া মুহিউদ্দীন (রাহঃ) প্রথমবারের মত ১৯৭১ সালে ফিলাডেলফিয়ায় আসেন৷ ফিলাডেলফিয়া বিমান বন্দরে সেদিন উনাকে স্বাগতম জানানোর জন্য মাত্র ৬/৭ জন ভক্ত উপস্থিত হয়েছিলেন৷ কয়েক মাস থাকার পর তিনি তাঁর জন্মভুমি শ্রীলংকা ফিরে যান৷ পুণরায় ১৯৭৩ সালে দ্বিতীয়বারের মত তিনি ফিলাডেলফিয়া আসেন এবং ডিসেম্বর ৮, ১৯৮৬ সাল তাঁর ওফাত পর্যন্ত দাওয়াতী কাজে উত্তর আমেরকিা ও কানাডার বিভিন্ন স্থানে সফর ছাড়া এখানেই তিনি অবস্থান করেন৷ তাঁর স্নেহ-ভালবাসায় শুধুমাত্র ফিলাডেলফিয়ার অন্ততঃ পাঁচশত পরিবার ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নেয়৷ তাঁর অনুসারীদের মধ্যে বহু উচ্চ শিক্ষিত লোক রয়েছে৷ যে সংবাদটি আমার মত অনেককেই আকৃষ্ট করেছে, আমরা সবাই জানি, ইসলামের আয়নার মুখোমুখী দাঁড়িয়ে যদিওবা প্রতিদিন বিভিন্ন ধর্মের মানুষ মুসলমান হচ্ছে কিন্ত্ত ইহুদী কেউ মুসলমান হয়েছে এমন খবর খুব একটা শুনা যায়নি, অথচ বাওয়ার অনুপম ব্যবহারের গুণে বহু ইহুদী এবং হিন্দু মুসলমান হয়ে আজ পর্যন্ত উত্তর আমেরিকা ও কানাডা সহ বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় দাওয়াতী কাজে মশগুল রয়েছেন৷

 

যতটুকু জানা যায় বাওয়া মুহিউদ্দীন (রাহঃ) শ্রীলংকার প্রত্যন্ত কোন অঞ্চলে অন্য কোন ধর্ম থেকে ইসলাম ধর্মে পুনঃদীক্ষিত হয়েছিলেন৷ উনবিংশ শতাব্দীর গোড়ার কথা, শ্রীলংকার কোন একটি জংগল অতিক্রম করছিলেন কয়েকজন মুসাফির, আল্লাহর ইচ্ছায় তাঁদের মুলাকাত হয় কঠোর সাধনায় মশগুল বাওয়া মুহিউদ্দীন (রাহঃ)র সাথে ৷ ক্বাদেরীয়া তরীকার অনুসারী বাওয়ার ইলমে লাদুন্নী বা আল্লাহ প্রদত্ত জ্ঞানের গভীরতায় তাঁরা মুগ্ধ হয়ে যান৷ কিছু দিন পর তাঁদের একজন পাশ্ববর্তী একটি গ্রামে বাওয়াকে দাওয়াত করেন৷ এখান থেকেই শুরু হয় বাওয়ার দাওয়াতী জীবন৷ তাঁরই একজন ভক্তের দাওয়াতে ১৯৭১ সালে তিনি ফিলাডেলফিয়ায় আসেন এবং বাওয়া মুহিউদ্দীন ফেলোশিপ অব্ নর্থ আমেরিকা ইন্ ফিলাডেলফিয়া (Bawa Muhaiyaddin Felloship of North America in Philadelphia) প্রতিষ্ঠা করেন৷ যে প্রতিষ্ঠানের শাখা-প্রশাখা ছড়িয়ে রয়েছে উত্তর আমেরকিা, কানাডা, শ্রীলংকা, অষ্ট্রেলিয়া এবং ইংল্যান্ডে৷

 

বাওয়ার স্বরচিত বিশের অধিক বই রয়েছে৷ রয়েছে শত শত অডিও ও ভিডিও ক্যাসেট৷ বাওয়া যেখানেই গিয়েছেন ধর্ম-দল-মত নির্বিশেষে সবাই বাওয়ার বয়ান শুনার জন্য, তাঁর দোয়া নেয়ার জন্য হাজির হয়েছে৷ আমেরিকার নামী-দামী বিভিন্ন পত্রিকা ও ম্যাগাজিন বাওয়ার ইন্টারভিউ নিয়েছে৷ জাতি সংঘের এসিসটেন্ট সেক্রেটারী জেনারেল রবার্ট মুলার সমগ্র মানব জাতির হেদায়েতের জন্য বাওয়ার দোয়া চেয়েছেন৷ ১৯৮০ সালে হোস্টেজ ক্রাইসিস্ এর সময় টাইম ম্যাগাজিন বাওয়ার দ্বারস্থ হয়েছিল৷ বাওয়ার সাক্ষাত্‎কার নেয়ার জন্য বিভিন্ন সময় যারা এসেছিল তাদের মধ্যে অন্যতম Psychology Today, The Harvard Divinity Bulletin, The Philadelphia Inquirer, এবং Pittsburgh Press.

 

বাওয়া ইংলিশ জানতেন বিধায় দোভাষীর সাহায্যে কথা বলতেন৷ তিনি তাঁর অনুসারীদেরকে মুরীদ না বলে চিলড্রেন (সন্তান) বলতেন৷ তিনি ছিলেন ভেজেটেরিয়ান৷ মাছ-মাংশ খাওয়ার অভ্যাস তাঁর ছিলনা৷ সে সময়ের কথা যতটুকু জানা যায়, মাছ ছিল দুর্লভ আর হারাম সন্দেহে মাংশ খাওয়া থেকে বিরত থাকা ছাড়া কোন উপায় ছিলনা৷ তাছাড়া দামের প্রশ্ন তো আছেই৷ যে কারণে আজ পর্যন্ত বাওয়ার অনুসারীরা বাওয়ার পছন্দের সস্তা খাবার ছাড়া অন্য কোন খাবার খাননা৷

 

কারামতঃ অলৌকিক কিছু কোন নবী থেকে প্রকাশ পেলে বলে মুজিজা আর কোন অলী থেকে প্রকাশ পেলে বলে কারামত৷ চাঁদকে দ্বিখন্ডিত করা নবীর মুজিজা; মুহুর্তের মধ্যে রানী বিলকিসের সিংহাসন নিয়ে আসা অলীর কারামত৷ বাওয়া মুহিউদ্দীন (রাহঃ)র ছিল অসংখ্য কারামত৷ জিয়ারতে গেলে বাওয়ার অনুসারীরা আমাদেরকে বাওয়ার বিভিন্ন কারামতের কথা শুনালেন৷ আমেরিকান সাদা মুসলমান ব্রাদার কবিরকে বাওয়া চক্ বলে ডাকতেন৷ ব্রাদার কবির একদা রাত ১০টার সময় একটি ট্রাক চালিয়ে যাচ্ছিলেন ফিলাডেলফিয়ার কোন এক রাস্তা দিয়ে৷ সামান্যের জন্য মারাত্মক একটি এক্সিডেন্ট থেকে তিনি রক্ষা পেলেন৷ পরদিন যখন তিনি বাওয়ার খেদমতে হাজির হলেন, উপস্থিত সবাই বলাবলি করতে লাগল, চক্ নিশ্চয় তোমার কিছু হয়েছে, গতরাত ১০টার সময় বাওয়া হঠাত্‎ আল্লাহু আকবার বলে চিত্‎কার দিয়ে উঠেন এবং খানিক পরে বলেন, চক এখন ও কে৷ ব্রাদার কবির বাওয়ার সামনে গেলে বাওয়া মুচকি হেসে বলেন কোন অসুবিধা নাই৷ বাওয়ার ইন্তেকালের পূর্বমুহুর্তে ব্রাদার কবির মনে মনে দোওয়া করছিলেন আল্লাহ! বাওয়ার বদলে তুমি আমাদের কাউকে নিয়ে যাও৷ বাওয়া তাঁর পাশে বসা দোভাষীকে আস্তে করে বললেন, চক্ (কবির)কে বল পেরেশান না হতে, এই ভারী দেহ নিয়ে আল্লাহর কাজ করা আমার জন্য এখন বড়ই কষ্টকর, আমি মুক্ত হতে পারলে খেদমত আরো বেগবান হবে৷

 

মসজিদঃ

জীবনের দীর্ঘ প্রায় ১৫টি বছর বাওয়া যে ঘরটিকে নিজের আস্তানা হিসেবে গ্রহন করেছিলেন সেই ঘরের পাশেই ১৯৮৪ সালে নির্মাণ করা হয় মসজিদ বাওয়া মুহিউদ্দীন আল-কাদেরী (রাহঃ)৷ বাওয়া স্বয়ং কন্সট্রাকশনের কাজে অংশ নেন৷ মসজিদটি দেখলে মন ভরে যায়৷ মসজিদের ভিতর মহিলাদের জন্য রয়েছে আলাদা ব্যবস্থা৷ দেয়ালে দেয়ালে শুভা পাচ্ছে কারুকার্যখচিত কুরআন শরীফের বিভিন্ন আয়াত৷ কি মনোরম সে দৃশ্য না দেখলে বুঝা যায়না৷ মসজিদের ইমাম গভীর জ্ঞানের অধিকারী ব্রাদার আব্দুর রাজ্জাক নর্থ আমেরিকায় একটি সুপরিচিত নাম৷   

 

মসজিদের ঠিকানাঃ

 5820 Overbrook Avenue
Philadelphia, PA 19131-1221, USA
Phone: 215-879-6300 (24 hour answering machine)
Fax: 215-879-6307

 

পানির কূপঃ বাওয়ার মাজার সংলগ্ন একটি অলৌকিক পানির কূপ রয়েছে৷ কথিত আছে, বাওয়া এই কূপের পানি পান করে তামিল ভাষায় বলেছিলেন জমজম৷ পানির স্বাদ সাধারণ পানি থেকে আলাদা৷ উত্তর আমেরিকা ও কানাডার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ভক্তরা ছুটে আসেন এবং বাওয়ার পছন্দের পানি নিয়ে যান৷ এই পানির হাকীকত আল্লাহ রাব্বুল আলামীনই ভাল জানেন তবে এটুকু বলতে পারি ভিন্ন স্বাদের এই পানিটি নিঃসন্দেহে বরকতময় একটি পানি৷ 

 

মাজারঃ

যতটুকু জানা যায়, বাওয়া মুহিউদ্দীন (রাহ)র মাজারই হচ্ছে উত্তর আমেরিকায় কোন সুফী দরবেশের প্রথম মাজার৷ বলতে হয় বাওয়ার নিখুত পছন্দ, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর, মনোরম একটি পরিবেশে, সবুজ বন-বনানী ঘেরা ফিলাডেলফিয়ার একটি প্রত্যন্ত অঞ্চলে তাঁর মাজার অবস্থিত৷

 

মাজারের পাশেই রয়েছে বাওয়ার ভক্তদের জন্য নির্ধারিত প্রাইভেট কবরস্থান যেখানে ইতিমধ্যেই বহু ভক্তকে সমাহিত করা হয়েছে৷ মাজার এরিয়ায় রয়েছে প্রায় পাঁচ শত একর, যেখানে অদূর ভবিষ্যতে হয়তোবা এমন কিছু গড়ে উঠবে আমেরিকায় বসবাসরত মুসলমানদের জন্য যা হতে পারে গভীর অন্ধকারে আশার আলো৷ মাজার সংলগ্ন ছোট মসজিদটি অদূর ভবিষ্যতে পূনঃনির্মান করা হবে বলে জানালেন বাওয়ার কয়েকজন ভক্ত৷

 

Mazar Address:

20 Fellowship Drive, East Fallowfield, PA 19320. USA. Tel: 215-879-6300. E-Mail: mosque_mazar@bmf.org     Website: http://www.bmf.org

 

মাজারের খাদিম হচ্ছেন ব্রাদার ইঞ্জিনিয়ার মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ যাঁর মূল বাড়ী মেইন স্টেইটে৷

 

উরসঃ প্রতি বছর অত্যন্ত গুরু গম্ভীর পরিবেশে উরস অনুষ্ঠিত হয়৷ আমেরিকা ও কানাডা সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শত শত মানুষ উরসে উপস্থিত হন৷ তবে আমাদের দেশের মত উরসের নামে বাওয়ার মাজারে নাফরমানীর প্রতিযোগিতা চলেনা৷ কুরআন তেলাওয়াত, বয়ান, মীলাদ মাহফিল ও বাচ্চাদের প্রোগ্রাম ছাড়া কোন রং ঢং স্থান পায়না বাওয়ার উরস মাহফিলে৷ 

 

বাওয়া ছিলেন আমাদের দশজনের মতই একজন ইমিগ্র্যান্ট৷ আমরা কেন পারিনা তাঁর মত হতে? সন্ত্রাসী কিংবা পলিটিশিয়ানদের মাধ্যমে ইসলাম আসে নাই এই আখেরী জামানায়৷ ইসলাম এসেছে আউলিয়ায়ে কেরামের খেদমত ও মেহনতের মাধ্যমে৷ আমাদের প্রিয় জন্মভুমি বাংলাদেশেও ইসলাম পৌঁছেছে আউলিয়ায়ে কেরামেরই মাধ্যমে৷ বাংলাদেশের মানুষ কি ভুলতে পারে হযরত শাহ জালাল মুজাররাদে ইয়ামানী (রাহঃ), হযরত শাহ আমনাত (রাহঃ), হযরত খান জাহান আলী (রাহঃ) সহ শত শত ওলী-আউলিয়ার কথা? আজকে যারা আউলিয়ায়ে কেরামের খেদমত সম্পর্কে বহুরূপী মন্তব্য করেন তাদেরকে বলব বাওয়া মুহিউদ্দীন (রাহঃ)র মত একটি দৃষ্টান্ত দেখান না দুনিয়ার মানুষকে! যাচ্ছেতাই বক্তৃতা দেয়া এক কথা আর একটি বাগান কায়েম করে সে বাগানে ফসল ধরানো আরেক কথা৷

 

 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
..................................................................................................................................... ....................