মুবারক সেই রজনী

মুহাম্মাদ আইনুল হুদা

মহানবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর মীলাদ বা জন্ম সোমবারে হয়েছে এব্যাপারে কোন দ্বিমত নেই৷ মুসলিম শরীফে হযরত আবু ক্বাতাদাহ আল-আনসারী (রাদ্বিঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ  সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে সোমবারের রোজা সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়েছিল, হুজুর উত্তরে বলেছেনঃ সোমবার এমন এক দিন যে দিন আমার জন্ম হয়েছিল এবং যে দিন আমার উপর ক্বুরআন নাজিল হয়েছিল৷ (মুসিলম শরীফঃ কিতাবুস সিয়ামঃ হাদীস নং ১৯৭৮) হাফিজ ইবনে কাছীর (রাহঃ)র মতে বিশুদ্ধ বর্ণনানুযায়ী আমুল ফীল বা "হাতীর বছর" (কা'বা শরীফ ধ্বংসের উদ্দেশ্যে বাদশাহ আবরাহার অভিযানের বছর)হুজুরের জন্ম হয়েছিল৷ ঐতিহাসিক ইবনে ইসহাকের মতে মশহুর বর্ণনামতে মাসটি ছিল রবিউল আউয়াল৷

ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বাল এবং ইমাম বাইহাক্বী (রাহঃ) হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদ্বিঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেনঃ তোমাদের নবীর জন্ম হয়েছে সোমবার, নবুওয়াত প্রকাশ হয়েছে বা প্রথম ওহী নাজিল হয়েছে সোমবার, ওফাত হয়েছে সোমবার, হিজরত করেছেন সোমবার এবং মদীনা শরীফে প্রবেশ করেছেন ঐ একই সোমবার৷

মশহুর বর্ণনামতে নবীজীর জন্ম হয়েছিল ১২ই রবিউল আউয়াল সোমবার সুবহে সাদিকের সময়৷ সমস্ত বিশ্বজগতের ইতিহাসে নবীজীর দুনিয়াতে আগমনের রাতের তুলনার আরেকটি রাত নেই৷ যে রাত আল্লাহর শ্রেষ্টতম সৃষ্ঠি, রাহমাতুল্লিল আলামীন বা সমস্ত বিশ্বজগতের জন্য আল্লাহর রহমত ও শ্রেষ্ঠতম নেয়ামত, আখেরী নবী, নবীদের নবী, রাসূলদের রাসূল, করুনার করুনা, বিশ্বমানবতার মুক্তির দূত মহানবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুনিয়ায় আগমন করেছেন৷ এজন্যেই কবি বলেনঃ "সকল ঈদের ঈদ, ঈদে মীলাদুন্নবী"৷

ইমাম, হাফিজ বাইহাক্বী (রাহঃ) নিজস্ব সনদে হযরত উসমান ইবনে আবুলআ'স আসসাক্বাফী থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেনঃ আমার মা জননী আমার কাছে বর্ণনা করেছেন যে, হযরত আমিনা বিনতে ওয়াহব যে রাত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে জন্ম দিয়েছিলেন সে রাত তিনি হযরত আমিনার কাছে উপস্থিত ছিলেন৷ তিনি বলেছেনঃ আমি ঘরের ভিতর যা কিছু দেখেছি সবই ছিল নূর, আমি আকাশের তারকারাজী দেখেছিলাম, ওরা এতই নিকটে এসে গিয়েছিল যে আমার মনে হচ্ছিল এই বুঝি আমার উপর পড়ে গেল৷ (দালাইলুন্নবুওয়াত ১/১১১, মাজমাউজ্জাওয়াইদ ৮/২২০) 

হযরত মাখযুম ইবনে হানি  আল-মাখযুমি তার পিতা, যার বয়স হয়ে ছিল ১৫০বছর, থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেনঃ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে রাত জন্ম গ্রহণ করেন সে রাত (পারস্য সম্রাট) কিসরার প্রাসাদ প্রকম্পিত হয়েছিল, প্রাসাদের ১৪টি প্রহরা চৌকি ভেঙ্গে পড়েছিল, পারস্যের আগুন নিভে গিয়েছিল, যা বিগত হাজার বত্‎সর নিভে নাই, বুহাইরায়ে সাওয়া (ইরানের অন্তর্গত সাওয়া নামক ঝিল) শুকিয়ে গিয়েছিল৷

আবূ মাখযুম অগ্নিপুজারী মজুসীদের ক্বাজী মুবিজানের স্বপ্নও বর্ণনা করেছেন৷ মুবিজান স্বপ্নে দেখল একটি নর উট এক দল আরবী ঘোড়াকে তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে, দিজলা বা দাজলা নদী অতিক্রম করে তারা সে দেশে ছড়িয়ে পড়েছে৷ এই স্বপ্ন মজুসী এবং পারস্য সম্রাট কিসরাকে ভীতসন্ত্রস্ত করে তুলল৷ নায়েবে কিসরা নু'মান ইবনে মুনজির এই মারাত্মক স্বপ্ন সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য আব্দুল মাসীহ ইবনে বুক্বাইলাহ আল-গাসসানীকে গণক সাত্বীহ এর কাছে পাঠাল৷ সাত্বীহ ছিল শাম দেশের একজন বিখ্যাত গণক৷ আব্দুল মাসীহ সাত্বীহ এর দরবারে পৌঁছামাত্র তাকে কিছু বলার আগেই সে সব কিছু বলে দিল৷ সে তার বন্ধ চোখ দুটি খুলেই আব্দুল মাসী এর উদ্দেশ্যে বললঃ

আব্দুল মাসীহ একটি উট সওয়ার হয়ে সাত্বীহ এর কাছে এসেছে৷ অথচ সে (সাত্বীহ) তার কবরের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছে৷ (হে আব্দুল মাসীহ) তোমাকে পাঠিয়েছে বনূ সাসান এর সম্রাট৷ কারণ প্রাসাদ প্রকম্পিত হয়েছে৷ আগুন নিভে গিয়েছে৷ মুবিজান স্বপ্ন দেখেছ, একটি নর উট এক দল আরবী ঘোড়াকে তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে, দিজলা বা দাজলা নদী অতিক্রম করে তারা সে দেশে ছড়িয়ে পড়েছে৷

আবার সে বলল: হে আব্দুল মাসীহ! তিলাওয়াত যখন বেড়ে যাবে, লাটিওয়ালা যখন হেব জয়ী, বন্যা হবে যখন সামাওয়া উপত্যকায়, বুহাইরায়ে সাওয়া যেদিন শুকিয়ে যাবে, নিভে যাবে যেদিন পারস্যের অগ্নি; সাত্বীহের জন্য সেদিন শাম দেশ আর শাম থাকবেনা৷ রাজত্ব করবে তাদের রাজা ও রানীগণ প্রহরাচৌকির সংখ্যানুসারে৷ যা আসার আসবেই৷ অতঃপর সেখানেই সাত্বীহ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল৷(মাওলিদু রাসূলিল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম - হাফিজ ইবনে কাছীর)

এই স্বপ্ন ছিল কিসরা সাম্রাজ্যের পতন এবং সেথায় ইসলামের সূর্যোদয়ের একটি পূর্বসংকেত৷ পরবর্তীতে তাই ঘটেছিল৷ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেনঃ কায়সার (রোমসম্রাট) ধ্বংস হলে আর কোন কায়সার নাই এবং কিসরা (পারস্যসম্রাট) ধ্বংস হলে আর কোন কিসরা ও নাই৷ ঐ জাতের নামে শপথ যাঁর হাতে আমার জীবন, কায়সার ও কিসরার সকল রত্ন আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় হবে৷ (বুখারী মুসলিম)

হাফিজ ইবনে কাছীর নাতিদীর্ঘ আলোচনার পর বলেনঃ "মোটকথা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর জন্মরজনীটি ছিল একটি মহান মর্যাদাপুর্ণ রজনী; ঈমানদারদের জন্য খুশী ও আনন্দের রজনী; পবিত্র, আলোময় একটি মহান পূণ্যময় রজনী৷ যে রজনীতে সংরক্ষিত, মনোনীত, সৃষ্ঠির সেই মূল মহারত্নকে আল্লাহ তা'লা প্রকাশ করে দিলেন৷ যাঁর নূর ব্যভিচার মুক্ত এবং সমকালীন শরীয়তে বৈধ বিবাহের মাধ্যমে মর্যাদাশীল প্রত্যেক পৃষ্ঠদেশ থেকে পবিত্র, পূণ্যবান গর্ভে স্থানান্তর হয়ে হয়ে দুনিয়াতে আগমন করলেন৷ এভাবে আবুলবাশার বা আদি পিতা হযরত আদম আলাইহিস সালাম থেকে শুরু করে নবুওয়াত এসে পৌঁছল আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুল মুত্তালিব পর্যন্ত৷ আব্দুল্লাহ হতে সেই মহারত্নকে গর্ভে ধারণ করলেন হযরত আমিনা বিনতে ওয়াহব জুহরিয়া৷ অতঃপর এই মহান পূণ্যময় রজনীতে তিনি তাঁকে জন্ম দিলেন৷ তাঁর ওসিলায় আত্মিক ও বাস্তবিক ঐ সব নূর প্রকাশ পেল যা আলোয় উদ্ভাসিত করল বুদ্ধি বিবেক আর সকল দৃষ্ঠি শক্তিকে৷ বুজুর্গ উলামায়ে কেরামের দৃষ্ঠিতে যা আহাদীস ও আখবার সমুহের সাহায্যে প্রমাণিত৷" - মাওলিদু রাসূলিল্লাহ

মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক্ব বলেনঃ মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নাভি কর্তিত এবং খতনাকৃত অবস্থায় জন্ম গ্রহণ করেছেন৷ জন্মের সাথে সাথেই তিনি আল্লাহর উদ্দেশ্যে সেজদায় লুটিয়ে পড়েন৷৷ উপস্থিত মহিলাগণ মক্কাবাসীদের রেওয়াজ অনুযায়ী নবজাতকের উপর একটি পাথরের হাড়ি উপুড় করে রাখতে উদ্যত হন, কিন্ত্ত হাড়িটি আপনা আপনি তাঁর কাছ থেকে সরে যায়৷ মহিলাগণ দেখলেন নবজাতকের চোখ দুটি খুলা এবং তিনি আকাশের দিকে চেয়ে আছেন৷ মায়ের গর্ভে থাকতে তাঁর পিতা ইন্তেকাল করেছিলেন তাই মহিলাগণ দাদা আব্দুল মুত্তালিবকে এব্যাপারে অবগত করলেন৷ আব্দুল মুত্তালিব মহিলাদেরকে বললেনঃ আপনারা নবজাতকের প্রতি লক্ষ্য রাখুন, আমি আশা করি সে খুবই শানওয়ালা ও ভাগ্যবান হবে৷ - মাওলিদু রাসূলিল্লাহ

একটি বর্ণনায় আছে, হযরত আমিনা যখন গর্ভবতী তিনি স্বপ্নে দেখেন কেউ একজন তাঁকে বলছেন আমিনা! তুমি মানবজাতির সর্দার বা শ্রেষ্ট সন্তান গর্ভে ধারন করেছ, সন্তান প্রসব করলে নাম রাখবে মুহাম্মাদ৷ (সীরাতে ইবনে হিশাম ১/১৯৪-১৯৫, আল-মাওলিদুল বরজিঞ্জী)

অসমাপ্ত