|
চাঁদ দেখা বিতর্কঃ হানাফী মাযহাবের ফায়সালা |
|
|
মুহাম্মাদ আইনুল হুদা |
|
|
বিসমিল্লাহ, ওয়ালহামদুলিল্লাহ ওয়াসসালাতু ওয়াসসালামু আলা রাসূলিল্লাহ হানাফী মাযহাবে রামাদ্বান ও ঈদের চাঁদ দেখার ব্যাপারে কোন দ্বিমত নেই, নেই কোন বিতর্ক৷ এব্যাপারে হানাফী মাযহাবের চুড়ান্ত ফায়সালা ফ্বিক্বহের কিতাব সমুহে উল্লেখ রয়েছে৷ কিন্ত্ত আমরা যারা বিতর্ক করি, সবার আগে বলতে হবে, হানাফী মাযহাব বলতে আমরা কি বুঝি৷ হানাফী মাযহাব বলতে আমরা যদি মাযহাবের মূলনীতির ভিত্তিতে আইম্মায়ে মাযহাব অর্থাত্ ইমাম আবূ হানিফা, ইমাম আবূ ইউসুফ এবং ইমাম মুহাম্মাদ (রাহঃ)র মাযহাবকে বুঝি তাহলে এই মাসআলায় কোন ধরনের বিতর্ক নেই৷ কিন্ত্ত হানাফী মাযহাব বলতে আমরা যদি আইম্মায়ে মাযহাব গত হওয়ার কয়েক শ' বছর পর হানাফী মাযহাবের মুক্বাল্লিদ বা অনুসারী এক বা একাধিক ইমাম বা আলেমের মাযহাবকে বুঝি তাহলে ঐ মাযহাবে অবশ্যই আলোচ্য মাসআলায় বিতর্ক রয়েছে৷ হানাফী মাযহাবের উসূল বা মূলনীতির বাইরে আরো কোন হানাফী মাযহাব আছে বলে আমার জানা নেই৷ হানাফী মাযহাবের মূলনীতিঃ " اَلْمُفْتِيْ فِيْ زَمَانِنَا مِنْ اَصْحَابِنَا اِذَا اسْتُفْتِيَ فِيْ مَسْئَلَةٍ وَ سُئِلَ عَنْ وَّاقِعَةٍ اِنْ كَانَتِ الْمَسْئَلَةُ مَرْوِيَّةً عَنْ اَصْحَابِنَا فِيْ الرِّوَايَاتِ الظَّاهِرَةِ بِلاَ خِلاَفٍ بَيْنَهُمْ فَاِنَّه يَمِيْلُ اِلَيْهِمْ وَيُفْتِيْ بِقَوْلِهِمْ ، وَلاَ يُخَالِفُهُمْ بِرَأْيِه ، وَاِنْ كَانَ مُجْتَهِدًا مُتْقِنًا، لاَنَّ الظَّاهِرَ اَنْ يَّكُوْنَ الْحَقُّ مَعَ أَصْحَابِنَا ، وَلاَ يَعْدُوْهُمْ ، وَاجْتِهَادُه لاَ يَبْلُغُ اجْتِهَادَهُمْ ، وَلاَ يُنْظَرُ اِلى قَوْلِ مَنْ خَالَفَهُمْ ، وَلاَ يُقْبَلُ حُجَّتُه ، لاَنَّهُمْ عَرَفُوْا الاَدِلَّةَ وَ مَيَّزُوْا بَيْنَ مَا صَحَّ وَ ثَبَتَ وَ بَيْنَ ضِدِّه ، فَاِنْ كَانَتِ الْمَسْئَلَةُ مُخْتَلَفًا فِيْهَا بَيْنَ اَصْحَابِنَا فَاِنْ كَانَ مَعَ اَبِيْ حَنِيْفَةَ رَحِمَهُ اللهُ تَعَالى اَحَدُ صَاحِبَيْهِ يُؤْخَذُ بِقَوْلِهِمَا لِوُفُوْرِ الشَّرَائِطِ وَاسْتِجْمَاعِ اَدِلَّةِ الصَّوَابِ فِيْهِمَا ، وَاِنْ خَالَفَ اَبَا حَنِيْفَةَ رَحِمَهُ اللهُ تَعَالى صَاحِبَاهُ فِيْ ذلِكَ فَاِنْ كَانَ اخْتِلاَفُهُمْ اخْتِلاَفَ عَصْرٍ وَ زَمَانٍ كَالْقَضَاءِ بِظَاهِرِ الْعَدَالَةِ يُؤْخَذُ بِقَوْلِ صَاحِبَيْهِ لِتَغَيُّرِ اَحْوَالِ النَّاسِ ، وَفِيْ الْمُزَارَعَةِ وَالْمُعَامَلَةِ وَنَحْوِهِمَا يُخْتَارُ قَوْلُهُمَا
"আমাদের জামানার হানাফী মাযহাবের কোন মুফতি যদি কোন ফতোয়া অথবা কোন ঘটনা স্ম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হন তাহলে, মাসআলাটি যদি জাহিরী রেওয়ায়েতে আইম্মায়ে মাজহাব(ইমাম আবু হানিফা. ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ রাহঃ) থেকে সর্বসম্মত ভাবে বর্ণিত হয়ে থাকে তাহলে তিনি(জামানার মুফতি)তাঁদের ফতোয়াকে গ্রহন করবেন.তাদের ফতোয়া মোতাবেক ফতোয়া দিবেন. এবং তিনি তাঁর ব্যক্তিগত কোন রায় দিয়ে তাঁদের (আইম্মায়ে মাজহাবের) বিরোধিতা করবেন না যদিও তিনি একজন দক্ষ মুজতাহিদ হন৷ কেননা স্পষ্টতঃ হক আইম্মায়ে মাজহাবের সাথেই থাকবে.(এই জামানার মুফতি) তাঁদের উপর বাড়াবাড়ি, তাঁদের বিরোধিতা করতে পারেন না, এবং তাঁর ইজতিহাদ আইম্মায়ে মাজহাবের ইজতিহাদ পর্যন্ত পৌছতে পারবেনা৷ যে তাঁদের রায়ের বিরুদ্ধে রায় দিবেন তাঁর রায়ের প্রতি দৃষ্টিপাত করা হবেনা এবং তাঁর দলিল গ্রহণ করা যাবেনা৷ কেননা দলীল প্রমাণ সম্পর্কে তাঁরা (আইম্মায়ে মাজহাব) অভিজ্ঞ ছিলেন এবং কোনটি ছহীহ প্রমাণিত আর কোনটি তা নয় তা তাঁরা পার্থক্য করেই মতামত দিয়েছেন৷ পক্ষান্তরে মাসআলাটি যদি আইম্মায়ে মাজহাবের মধ্যে বিতর্কিত হয় তবে ইমাম আবু হানিফা (রাহঃ)র সাথে যদি তাঁর দুই শাগরেদের কোন একজন থাকেন তাহলে তদুভয়ের রায়কে গ্রহণ করা হবে, তাঁদের মধ্যে প্রয়োজনীয় সকল শর্ত ও দলীল-প্রমাণের প্রাচুর্যতা থাকার কারণে৷ আর যদি ইমাম সাহেবের সাথে তাঁর উভয় শাগেরদই কোন মাসআলায় বিরোধিতা করেন তাহলে মতবিরোধটা যদি স্থান ও কালের সাথে সম্পর্কিত হয়, যেমন বিচার বিভাগীয় কোন বিষয়, তখন তাঁদের উভয়ের(উভয় শাগরেদ) রায়কে গ্রহণ করা হবে৷ আর কৃষি ও লেনদেন বিষয়ক মাসআলায় তাঁদের উভয়ের রায়কে প্রধান্য দেয়া হবে৷ (ফতোয়ায়ে খানিয়া. ১ম খন্ড, রাসমুল মুফতি অধ্যায়, পৃষ্ঠা ১ ও ২)
শামীতে আছেঃ رَسْمُ الْـمُـفْتِيْ أنَّ مَا اتَّفَقَ عَلَيْهِ اَصْحَابُنَا فِيْ الرِّوَايَاتِ الظَّاهِرَةِ يُفْتِيْ بِه قَطْعًا ، وَاخْتُلِفَ فِيْمَا اخْتَلَفُوْا فِيْهِ ، وَالاَصَحُّ كَمَا فِيْ السِّرَاجِيَّةِ وَغَيْرِهَا اَنَّه يُفْتِيْ بِقَوْلِ الاِمَامِ عَلَى الاِطْلاَقِ ، ثُمَّ بِقَوْلِ الثَّانِيْ ، ثُمَّ بِقَوْلِ الثَّالِثِ ، ثُمَّ بِقَوْلِ زُفَرَ وَالْحَسَنِ بْنِ زِيَاد ( رد المحتار على الدر المختار)"জাহিরে রেওয়ায়েতে আইম্মায়ে মাযহাব যে মাসআলায় একমত জামানার মুফতিকে অবশ্যই সে মুতাবেক ফতোয়া দিতে হবে৷ যে মাসআলায় আইম্মায়ে মাযহাবের দ্বিমত রয়েছে সে মাসআলায় কার মতে ফতোয়া দিতে হবে এই বিষয়ে দ্বিমত আছে৷ তবে সিরাজিয়া গং কিতাবে যেমন উল্লেখ আছে, শুদ্ধতম মত হচ্ছে, শর্তহীনভাবে ইমাম আবু হানিফার মতানুযায়ী ফতোয়া দিতে হবে৷ যদি আবূ হানিফার মত পাওয়া না যায় তবে ইমাম আবূ ইউসুফের মতানুযায়ী ফতোয়া দিতে হবে৷ যদি ইমাম আবূ হানিফা এবং ইমাম আবূ ইউসুফ কারো কোন মত পাওয়া না যায় তবে ইমাম মুহাম্মাদ (রাহঃ)র মতানুযায়ী ফতোয়া দিতে হবে৷ যদি এই তিনজনের কারো কোন মত পাওয়া না যায় তখন ইমাম জুফার ও হাসান ইবনে জিয়াদের মতানুযায়ী ফতোয়া দিতে হবে৷" (শামী, ১ম খন্ড, পৃষ্ঠ ১৬৮-১৭১)
এই হল হানাফী মাযহাবের মূলনীতি৷ এতে আমরা পেয়েছিঃ
সুতরাং বুঝা গেল আলোচ্য মাসআলায় যদি জাহিরে রেওয়ায়েত পাওয়া যায় তাহলে মাযহাবের মূলনীতির ভিত্তিতে এই মাসআলায় আমাদের মধ্যে আর কোন বিতর্ক থাকতে পারেনা৷
শামীতে আছেঃ وَاخْتِلاَفُ الْمَطَالِعِ وَ رُؤْيَتُه نَهَارًا قَبْلَ الزَّوَالِ وَبَعْدَه غَيْرُ مُعْتَبَرٍ عَلى ظَاهِرِ الْمَذْهَبِ ، وَعَلَيْهِ اَكْثَرُ الْمَشَائِخِ ، وَ عَلَيْهِ الْفَتْوَى জাহিরে মাযহাব (জাহিরে রেওয়ায়েত) মুতাবেক উদয়স্থলের ভিন্নতা এবং দিনের বেলায় চাঁদ দেখা, দূপুরের পূর্বে বা পরে, গ্রহণযোগ্য নয় এবং এটাই হল অধিকাংশ মাশাইখদের সিদ্ধান্ত এবং এর উপরই ফতোয়া৷ (শামী, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা ৩৬৩/৬৪) এই ফতোয়া এবং চুড়ান্ত সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ রয়েছে হানাফী মাযহাবের সকল কিতাবে যেখানেই আইম্মায়ে মাযহাব তথা ইমাম আবূ হানিফা, ইমাম মুহাম্মাদ এবং ইমাম আবূ ইউসুফ (রাহঃ)র সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ করা হয়েছে৷ ফতহুল ক্বাদীর শরহে হেদায়াঃ "যখন কোন শহরে চাঁদ দেখে রমজান সাব্যস্ত হয়ে যায় তখন সকলের উপর হুকুম প্রযোজ্য/লাজিম হয়ে যাবে৷ সুতরাং আহলে মাগরিবের দেখায় আহলে মাশরিকের উপর হুকুম (রোজা ও ঈদ) প্রযোজ্য হয়ে যাবে জাহিরে রেওয়ায়েত মুতাবেক৷ আবার বলা হয় যে / কথিত আছে যে, উদয়স্থলের ভিন্নতা গ্রহণযোগ্য হবে৷" এতটুকু লেখার পর ইমাম ইবনুল হুমাম (রাহঃ) "ওয়াক্বীলা বা বলা হয় / কথিত আছে" বলে তিনি যে দূর্বল একটি মত উল্লেখ করেছিলেন সেই মতের সমর্থনে যে যুক্তি ও দলীল পেশ করা হয় সেই যুক্তি ও দলীল উল্লেখ করে কেন এই মত মানা যাবেনা এর জবাব দিয়েছেন৷ আর সর্বশেষে আবার "ওয়াল আখজু বি জাহিরির রিওয়ায়াতি আহওয়াত্বু" বলে জাহিরে রেওয়ায়েত অনুযায়ী আমল করার সিদ্ধান্ত দিয়ে তিনি তাঁর বক্তব্য শেষ করেছেন৷ (২য় খন্ড, পৃষ্ঠা ২৪৩) দারুল উলুম দেওবন্দঃ "ইহা স্বীকৃত যে বিশুদ্ধ ও নির্ভরশীল মাযহাব অনুযায়ী রোজা ও ঈদের ব্যাপারে চাঁদের উদয়স্থলের ভিন্নতা গ্রহণযোগ্য নয়৷ পশ্চিমাঞ্চলের চাঁদ দেখার কারণে পূর্বাঞ্চলের উপর হুকুম ছাবিত হয়ে যায়৷ আর যেহেতু গ্রহণযোগ্য, প্রাধান্যপ্রাপ্ত, জাহিরে রেওয়ায়েত এবং মুফতা বিহী (যে মতের উপর ফতোয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে) সিদ্ধান্ত হচ্ছে চাঁদের উদয়স্থলের ভিন্নতা গ্রহণযোগ্য নয় সুতরাং আমরা মাযহাব অনুসারী (মুকাল্লিদ) দের জন্য এই বিষয়ে বাহাস্ (আলোচনা) করার কোন অবকাশ নেই৷ কারণ মুহাক্কিক ফক্বীহদের সিদ্ধান্ত আমাদের জন্য দলীল হিসেবে যথেষ্ট৷ (ফাতাওয়ায়ে দারুল উলুম দেওবন্দ) ফাতাওয়ায়ে দারুল উলুম দেওবন্দের উদ্বৃতি দেখে কেউ আবার মনে করবেন না যে, হানাফী মাযহাব ফাতাওয়ায়ে দারুল উলুম দেওবন্দের উপর নির্ভরশীল৷ বরং মাযহাবের চুড়ান্ত ফায়সালাটি দারুল উলুম দেওবন্দে উর্দু ভাষায় উল্লেখ করা হয়েছে মাত্র৷ মাযহাবের চুড়ান্ত সিদ্ধান্তের উল্লেখ রয়েছে এমন কয়েকটি কিতাবের নাম দেয়া হল৷
হানাফী মাযহাবের দলীলঃ রামাদ্বান মাসের রোজা কার উপর ফরজ এ প্রসংগে ক্বুরআন শরীফে আল্লাহ বলেছেনঃ (3) فَمَنْ شَهِدَ مِنْكُمُ الشَّهْرَ فَلْيَصُمْهُ সুতরাং তোমাদের মধ্যে যে লোক মাসটি পাবে সে যেন রোজা রাখে৷ (সুরা বাক্বারাহঃ আয়াত ১৮৫) কিভাবে মাস পাওয়া যায় এ প্রসংগে বিভিন্ন তাফসীরে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে৷ ইমাম আবূ বকর জাসসাস্ রাজী তাঁর বিশ্ব বিখ্যাত "আহকামুল্ ক্বুরআন" এ ব্যাপারে সবিস্তারে আলোচনা করা হয়েছে৷ ঐ সমস্ত আলোচনার সার সংক্ষেপ হচ্ছেঃ শরীয়তের মুকাল্লাফ (মুসলিম, বালিগ্ব, আক্বিল, সুস্থ, হায়েজ-নেফাস থেকে পবিত্র) এবং মুক্বীম যে ব্যক্তি চাঁদ দেখে অথবা চাঁদ দেখার বিশ্বস্ত সংবাদ পায় অথবা পূর্ববর্তী আরবী মাস ত্রিশ দিন পুরা হয়ে যায় সে মাস পেল এবং তার উপর রামাদ্বানের রোজা রাখা ফরজ৷ এই আয়াতের সাথে বুখারী-মুসলিমের কয়েকটি বিশুদ্ধ হাদীস শরীফ উল্লেখ করা হয় হানাফী মাযহাবের দলীল হিসাবে৷ চাঁদ দেখার ব্যাপারে হুজুর বলেছেনঃ صُوْمُوْا لِرُؤيَتِه وَ اَفْطِرُوْا لِرُؤْيَتِه চাঁদ দেখা হলে রোজা রাখো আবার চাঁদ দেখা হলে ইফতার অর্থাত্ ঈদ করো৷ আবার মেঘাচ্ছন্নতা বা সংশ্লিষ্ট কোন কারণে চাঁদ দেখা না গেলে হুজুর বলেছেন শাবান মাস পুরা করে রামাদ্বান মাস শুরু করো৷ আয়াতে ক্বুরআন বা এইসব হাদীস শরীফে দেশে দেশে চাঁদ দেখে ভিন্ন ভিন্ন দিনে রোজা ও ঈদ করার কোন উল্লেখ বা ইঙ্গিত নাই বিশ্বাসেই আইম্মায়ে মাযহাব চাঁদের উদয়স্থলের ভিন্নতা গ্রহণযোগ্য নয় বলে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন৷ হাদীসে কুরাইব প্রসংগ হাদীসে কুরাইব হযরত মুয়াবিয়া (রাদ্বিঃ)র জামানার একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে বর্ণিত হয়েছে, সংগত কারণেই আইম্মায়ে মাযহাব যা গ্রহণ করেন নাই৷ ইমাম ইবনুল হুমাম হাদীসে কুরাইব উল্লেখ করেই জাহিরে রেওয়ায়েত অনুযায়ী আমল করার সিদ্ধান্ত দিয়েছেন এই বলেঃ وَالاَخْذُ بِظَاهِرِ الرِّوَايَةِ اَحْوَطُ হাদীসে কুরাইব প্রসংগে নিম্নোক্ত কিতাব সমুহ দেখা যেতে পারেঃ
হাদীসে কুরাইব মূলতঃ সাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদ্বিঃ'র একটি মুজমাল উক্তি বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন বিভিন্ন ইমাম৷ যা (একটি মুজমাল উক্তি) ক্বুরআন শরীফের স্পষ্ট আয়াত এবং স্পষ্ট ও বিশুদ্ধ হাদীসের বিপরীতে দলীল হিসাবে সাব্যস্ত হওয়ার যোগ্যতা রাখেনা৷ তাছাড়া হাদীসে কুরাইবের ভিত্তিতে ৪৮ মাইল, ৪৮০ মাইল সহ বিভিন্ন হিসাবের কথা এসেছে অথচ আরবী মাস শুরু করার ব্যাপারে হিসাব কিতাব করা যাবেনা বলে বিশুদ্ধ হাদীসে হুজুর বলেছেনঃ اِنَّا اُمَّةٌ اُمِّيَّةٌ ، لاَ نَكْتُبُ وَلاَ نَحْسُبُ আমরা উম্মী জাতি, (আরবী মাস শুরু করার ব্যাপারে) আমরা হিসাব কিতাব করিনা৷ (মুসলিমঃ সিয়াম ১৮০৬, নাসাঈঃ সিয়াম ২১১১/১২, আবূদাঊদঃসাওম ১৯৭৫, বাইহাক্বীঃ সিয়াম ৮২০০) পশ্চিমাঞ্চল / পূর্বাঞ্চল প্রসংগ কোন কোন কিতাবে উল্লেখ রয়েছে পশ্চিমাঞ্চলের চাঁদ দেখা পূর্বাঞ্চলের জন্য প্রযোজ্য আবার অন্যান্য কোন কোন কিতাবে রয়েছে পূর্বাঞ্চলের চাঁদ দেখা পশ্চিমাঞ্চলের জন্য প্রযোজ্য৷ মনে রাখতে হবে পশ্চিমাঞ্চল / পূর্বাঞ্চল মূল মাসআলা নয়৷ চাঁদ পশ্চিমাঞ্চলে দেখা গেল না পূর্বাঞ্চলে দেখা গেল সেটা বড় কথা নয়, হানাফী মাযহাবের মূল মাসআলা হচ্ছে اِخْتِلاَفُ الْمَطَالِعِ غَيْرُ مُعْتَبَرٍ চাঁদের উদয়স্থলের ভিন্নতা গ্রহণযোগ্য নয়৷ সময়ের ব্যবধান প্রসংগ একটি অবান্তর প্রশ্ন আমাদেরকে বিভ্রান্ত করে৷ অমুক অঞ্চলের চাঁদ দেখা মানব আমরা সেই অঞ্চলের টাইমে রোজা রাখি? ইফতার করি? নামাজ পড়ি? আমাদের দেশে "চাঁদের উদয়স্থলের ভিন্নতা গ্রহণযোগ্য" এই মাসআলার ভিত্তিতে যাঁরা রোজা ঈদ করেন তাঁরা কি যে অঞ্চলে চাঁদ দেখা গিয়েছে সেই অঞ্চলের টাইমে রোজা রাখেন? ইফতার করেন? নামাজ পড়েন? উত্তর না৷ রোজা রাখা, ইফতার করা, নামাজ পড়া সময় ও সূর্যের সাথে সম্পর্কিত৷ আরবী মাস শুরু করা চাঁদ ও মাসের সাথে সম্পর্কিত৷ চাঁদ দেখা হলে কিংবা ত্রিশ দিন পুরা হয়ে গেলে নতুন আরবী মাস শুরু হয়ে গেল এবার রোজা রাখা, ইফতার করা, নামাজ পড়া স্থানীয় সময় অনুযায়ী পালনীয়৷ একই মাস দুইবার শুরু হয় না চাঁদ দেখার তারতম্যের কারণে একই মাস দুইবার শুরু হয় না৷ হ্যাঁ তবে যদি কোন অঞ্চল চাঁদ না দেখে এবং চাঁদ দেখার বিশ্বস্ত সংবাদ বিলকুল না পায়৷ ফাতাওয়ায়ে তাতারখানিয়ায় রয়েছেঃ মুনতাক্বা কিতাবে রয়েছেঃ বিশর বর্ণনা করেন (ইমাম) আবূ ইউসুফ থেকে এবং ইবরাহীম বর্ণনা করেন (ইমাম) মুহাম্মাদ থেকেঃ কোন শহরবাসী চাঁদ দেখে ত্রিশটা রোজা রাখল, অন্য শহরবাসী চাঁদ দেখে রোজা রাখল উনত্রিশটা, যারা ২৯টি রেখেছেন তাদের একটি রোজা কাজা করতে হবে "(কারণ উদয়স্থলের বিভিন্নতা গ্রহণযোগ্য নয়)৷ বুঝা গেল মাস একবারই শুরু হয়, চাঁদ দেখার তারতম্যের কারণে একই মাস দুইবার শুরু হয় না৷ (২য় খন্ড, পৃষ্ঠা ৩৫৫) ইমাম ক্বুদূরী গং প্রসংগ ইমাম ক্বুদূরী সহ মুতাআখখিরীন কোন কোন হানাফী ইমাম চাঁদের উদয়স্থলের ভিন্নতা গ্রহণযোগ্য বলে তাঁদের ব্যক্তিগত মত প্রকাশ করেছেন বলে কেউ কেউ দাবী করে থাকেন৷ হানাফী মাযহাবের মূলনীতির ভিত্তিতে এই মাসআলা এবং এই ধরনের অন্য যে কোন মাসআলায় মাযহাবের জাহিরে রেওয়ায়েতের বিপরীতে ইমাম ক্বুদূরী বা ছাহেবে হেদায়ার মত আসহাবে তারজীহ স্থরের মুজতাহিদ বা ইমামমের বক্তব্য যে মুক্বাল্লিদ বা মাযহাব অনুসারীদের জন্য গ্রহণযোগ্য নয় একথা আলেম মাত্রই জানা আছে৷ এজন্য হানাফী মাযহাবের যে সব কিতাবে হানাফী ফক্বীহদের স্থরবিন্যাস করা হয়েছে সে সব কিতাব দেখা যেতে পারে৷ দেখুন শামী, ১ম খন্ড, তাবাক্বাতুল ফুক্বাহা অধ্যায়, পৃষ্ঠা ১৮০৷ ইমাম আবূ হানিফা (রাহঃ) আজ বড়ই পরিতাপের বিষয় হানাফী মাযহাবের অনুসারী কিছু কিছু আলেম চাঁদ দেখা বিতর্কে নিছক দলাদলির কারণে ইমাম আবূ হানিফা (রাহঃ) সম্পর্কে নানা কটুক্তি করে থাকেন৷ আবূ হানিফার ফায়সালা অবৈজ্ঞানিক! অসম্ভব!! ক্বুরআন-সুন্নাহ পরিপন্থি!!! ইমাম আবূ হানিফা (রাহঃ) সেই ব্যক্তি, যদিও তিনি সাহাবী নন, বুখারী-মুসলিম শরীফ সহ বিভিন্ন হাদীস গ্রন্থে ইমাম আবূ হানিফা এবং তাঁর ইলম সম্পর্কে স্পষ্ট ইঙ্গিতবাহী আল্লাহর রাসূলের কয়কটি বিশুদ্ধ হাদীস রয়েছে৷ যেমন মুসলিম শরীফে হযরত আবূ হুরাইরাহ (রাদ্বিঃ) থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেনঃ لَوْ كَانَ الدِّينُ عِنْدَ الثُّرَيَّا لَذَهَبَ بِهِ رَجُلٌ مِنْ فَارِسَ أَوْ قَالَ مِنْ أَبْنَاءِ فَارِسَ حَتَّى يَتَنَاوَلَهُ ( مسلم : كتاب فضائل الصحابة 4618) "দ্বীন (অন্য বর্ণনায় ইলম) যদি সুরাইয়া তারকাপুঞ্জের কাছেও হয় তথাপি পার্সিয়ানদের এক ব্যক্তি তা হাসিল করবে বা আয়ত্ব করবে৷" (মুসলিমঃ ফাদ্বাইলুস সাহাবাহঃ ফাদ্বলু ফারিস ৪৬১৮) হাফিজুল হাদীস ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূত্বী রাহঃ সহ অন্যান্য অনেক ইমামের মতে উল্লেখিত হাদীসে বর্ণিত "ব্যক্তি" ইমাম আবূ হানিফা ছাড়া কেউ নন৷ (শামীঃ মুক্বাদ্দিমাহ, ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা ১৪৭) আরেকটি হাদীসে বর্ণিত, হুজুরে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেনঃ تُرْفَعُ زِيْنَةُ الدُّنْيَا سَنَةَ خَمْسِيْنَ وَ مِائَة এক শ' পঞ্চাশ হিজরী সনে দুনিয়ার জীনত বা সৌন্দর্য তুলে নেয়া হবে৷ শামসুল আইম্মা ইমাম কুরদী বলেন এই হাদীসে দুনিয়ার জীনত বলে ইমাম আবূ হানিফার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে, কেননা তিনি এই সনেই ইন্তিকাল করেছিলেন৷ (শামী) আল্লামা শামী দীর্ঘ আলোচনার পর বলেনঃ وَالْحَاصِلُ اَنَّ اَبَا حَنِيْفَةَ النُّـعْمَانَ مِنْ اَعْظَمِ مُعْجِزَاتِ الْـمُصْطَفَى بَعْدَ الْـقُرْآنِ "সারকথা হল, কুরআন শরীফের পরে (ইমাম) আবূ হানিফা আন্নু'মান (রাহঃ) মুহাম্মাদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর শ্রেষ্টতম মু'জিজা৷" (শামী, ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা ১৫০) অর্থাত্ কুরআন শরীফ যেমন হুজুরের একটি মু'জিজা তেমনি ইমাম আবূ হানিফাও হুজুরের একটি মু'জিজা৷ হুজুরের মু'জিজা সমুহকে যদি ক্লাসিফাই করা যায় তাহলে মু'জিজার তালিকায় ক্বুরআন শরীফের পরই আবূ হানিফার স্থান৷ সুবহানাল্লাহ৷ আর আজ এই ইমাম আবূ হানিফা সহ প্রথম যুগের ইমামদের ফতোয়াকে বলা হচ্ছে ক্বুরআন-সুন্নাহ পরিপন্থি! অবৈজ্ঞানিক!! অসম্ভব!!! ইমাম আহমদ (রাহঃ) বলেনঃ اِذَا كَانَ فِيْ الْمَسْأَلَةِ قَوْلُ ثَلاَثَةٍ لَمْ يُسْمَعْ مُخَالَفَتُهُمْ যদি কোন মাসআলায় তিন জনের (ইমাম আবূ হানিফা, ইমাম মুহাম্মাদ এবং ইমাম আবূ ইউসুফ) অভিন্ন মত পাওয়া যায় তবে তাঁদের কোন বিরোধিতা শুনা যাবেনা৷ (মুক্বাদ্দিমায়ে ইলাউস সুনান) শেষ কথাঃ ফিক্বহের প্রায় সকল কিতাবেই চার মাজহাবের আলোচনা হয় এবং প্রায় সকল কিতাবেই প্রথমেই মাজহাবের সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ করা হয়, কোন কোন কিতাবে মাজহাবের সিদ্ধান্ত উল্লেখ করার পর অন্য মতটি উল্লেখ করে সবশেষে মাজহাবের সিদ্ধান্তটিকেই তারজীহ দেয়া হয়৷ একথা সর্বজন বিদিত যে, হানাফী মাজহাবের জাহিরে রেওয়ায়েত বর্তমান বিশ্বে চাঁদ দেখা বিতর্ক সমাধানে একটি যথোপযুক্ত সিদ্ধান্ত৷ প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে, চাঁদের উদয়স্থলের ভিন্নতা গ্রহণযোগ্য নয় এই সিদ্ধান্তটি হানাফী, মালিকী ও হাম্বালী এই তিন মাজহাবের চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত৷ একটি বর্ণনা মতে ইমাম শাফী (রাহঃ)র একই মত৷ মতভিন্নতা আছে ঠিক কিন্ত্ত ইজমায়ে উম্মত হল চার মাযহাবই হক্ব৷ আর হক্ব হানাফী মাযহাব ফতোয়ায়ে খানিয়া সহ ফিক্বহের কিতাব সমুহে স্পষ্ট বর্ণিত মূলনীতির উপর প্রতিষ্ঠিত৷ আমার এই নগন্য লেখায় চাঁদ দেখা বিতর্কের অবসান হয়ে যাবে এমন আশা আমি করছিনা৷ কিন্ত্ত আমি বলব যাঁরাই ভিন্নমত পোষন বা গ্রহণ করবেন তাঁদের উচিত্ সর্বপ্রথম হানাফী মাযহাবের প্রতিষ্ঠিত মূলনীতির বিপরীতে নতুন একটি মূলনীতির সন্ধান করা যার ভিত্তিতে আমরা সবাই অভিন্ন মত পোষন বা গ্রহণ করতে পারি৷ আমার এই ক্ষুদ্র লেখায় কোন ভুল বা গরমিল ধরা পড়লে আমাকে জানালে আমি কৃতজ্ঞতার সাথে সংশোধন হতে বাধ্য থাকব৷ |
|
|
মুহাম্মাদ আইনুল হুদা, ইমাম ও খতীব, আররাহমান জামে মসজিদ, নিউইয়র্ক৷ |
|
| ........................................................................................................................................... |